শ্রেণিকক্ষে এসে শিক্ষার্থীদের ভাইভা নিচ্ছিলেন ডা. রায়হান শরীফ। এ সময় আমার একটি পোষা পাখি আছে-এ কথা বলেই তার ব্যাগ থেকে পিস্তল বের করেন। পিস্তল দেখিয়ে বলেন, এটাই আমার 'পোষা পাখি।' পিস্তলটি নড়াচড়া করতেই গুলি বের হয়ে তমালের পায়ে লাগে। আরেক শিক্ষার্থী লাবিবার কানের পাশ দিয়ে যায়। গত সোমবার এমন অপ্রীতিকর এক ঘটনা ঘটে সিরাজগঞ্জে শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজে।
সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে রায়হান শরীফ। তিনি ওই কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা, হোস্টেলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মাদক অফার করা, অস্ত্র নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বদলির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় কলেজ প্রশাসন।
ঘটনার পর ঐ শিক্ষককে আটকে রেখে বিক্ষোভ করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। রায়হান শরীফ সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে এবং শহরের দত্তবাড়ী মহল্লার বাসিন্দা। তিনি শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক। শিক্ষার্থীরা বলেন, শিক্ষক রায়হান শরীফ উগ্র মস্তিষ্কের মানুষ।
কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া ও লাবিবা বলেন, শিক্ষক রায়হান শরীফ ছাত্রীদেরও উত্ত্যক্ত করতেন। আপত্তিকর ইশারা করতেন। ভয়ভীতিও প্রদর্শন করেন। কলেজ ক্যাম্পাসে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করেন তিনি। এসব বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানালেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ডা. রায়হান শরীফের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন তার সহকর্মী শিক্ষকরাও। কলেজের ফরেনসিক ও মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ হিল কাফিসহ একাধিক শিক্ষক বলেন, শিক্ষক রায়হান শরীফ এর আগেও কলেজে পিস্তল নিয়ে এসেছিলেন। বিষয়টি নজরে আসার পর তাকে সতর্ক করায় তিনি উলটো ভয় দেখিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও হোস্টেলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মাদক অফার করারও অভিযোগ রয়েছে। তাকে বেশ কয়েক বার বদলির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন কলেজ অধ্যক্ষ। ডিজি অফিসকে ম্যানেজ করে তিনি স্বপদে বহাল থাকেন।
রায়হান শরীফের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন কলেজের অধ্যক্ষ আমিরুল হোসেন চৌধুরীও। তিনি বলেন, ওই শিক্ষক এক ধরনের সাইকো। তার মেজাজ সবসময় চড়া থাকে। মাঝে মধ্যেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার খারাপ আচরণের অভিযোগ পাওয়া যায়। একাধিকবার তিনি কলেজ ক্যাম্পাসে পিস্তল নিয়ে ঢুকেছেন। শিক্ষার্থীরা প্রায়ই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়। তাকে বদলির জন্য কয়েক দফায় চেষ্টা করেছি। অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েও বদলি করাতে পারিনি।
শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ছাত্রকে গুলি করার ঘটনায় ডা. রায়হান শরীফের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি কীভাবে কলেজ ক্যাম্পাসে পিস্তল নিয়ে ঢুকলেন বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
সদর থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম বলেন, রায়হান শরীফের কাছ থেকে ৭.৫ বোরের একটি পিস্তল জব্দ করা হয়েছে। পিস্তলটির কোনো লাইসেন্স নেই। রায়হান শরীফকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মন্ডল বলেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক ছাত্রের পায়ে গুলি করেন শিক্ষক। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নামে মামলা হয়েছে।
এদিকে, আরাফাত আমিন তমালকে গুলি করায় রায়হান শরীফের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এদিকে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত সোমবার রাত ১২টার দিকে আহত তমালের বাবা বগুড়ার ধুনট উপজেলার ধামাচামা গ্রামের আব্দুল্লাহ আল আমিন বাদী হয়ে সদর থানায় মামলাটি দায়ের করেন।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, আহত ছাত্রের বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। এর আগেই অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করা হয়েছে। তাকে ঐ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। যে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছে সেটি আগেই জব্দ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, পিস্তলটি অবৈধ। অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা হয়েছে।
এদিকে এ ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন-স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক মো. মহিউদ্দিন মাতুব্বর, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ উপসচিব মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন।
ডাঃ রায়হান তদন্ত কমিটির কাছে স্বীকার করেছেন যে তিনিই শিক্ষার্থীকে গুলি করেছেন। তবে তা অনিচ্ছাকৃত বলে দাবি করেছেন তিনি। সোমবার স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়। কমিটির সদস্যরা মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মেডিকেল কলেজটিতে গিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁরা থানায় গিয়ে ডাঃ রায়হান শরীফের সাথে কথা বলেন।